স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সম্প্রচার মাধ্যমের ইতিহাস বিষয়ক বক্তৃতায় শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার

স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (এসইউবি)- এর উদ্যোগে আজ (০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০) ‘বাংলাদেশে সম্প্রচার মাধ্যমের ইতিহাস’ শীর্ষক এক বক্তৃতার আয়োজন করা হয়।‘সমকালীন সামাজিক চিন্তা’ বিষয়ক বক্তৃতামালার আওতায় আয়োজিত এ দ্বিতীয় বক্তৃতা অনুষ্ঠানে মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ শিল্প কলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা মনোয়ার। এতে সভাপতিত্ব করেন স্টেট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক এম.শাহজাহান মিনা।অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এসইউবির প্রো-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আনোয়ারুল কবির এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন এসইউবির ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের পরিচালক আবু তাহের খান।
সম্প্রচার মাধ্যমের ইতিহাস বলতে যেয়ে মুস্তফা মনোয়ার তার বক্তৃতায় বাংলাদেশ ভূখন্ডে গত ছয় দশকের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতির বিবর্তনটি ও বিভিন্ন ঘটনা ও তথ্যেও উদ্বৃতি দিয়ে বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান যে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রের প্রোগ্রামম্যানেজার থাকা কালে ২৪ মার্চ ১২টার সংবাদ বুলেটিনে প্রচার করেন যে, গতকাল পাকিস্তান দিবসের অনুষ্ঠানে পূর্ব বাংলার কোথাও পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করা হয়নি। তার এ সিদ্ধান্ত সেদিন টেলিভিশনে ঘোষণা করেন তারই সহকর্মী মাসুমা খাতুন। আর ঐ ঘোষণা দিয়েই তারা টেলিভিশন স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসেনএবং দীর্ঘ নয় মাস পর আবার ১৭ মার্চ এখানে ফিরে আসেন।
শিল্পের নান্দনিকতা প্রসঙ্গে মুস্তফা মনোয়ার বলেন, এটি যতোটা দৃশ্যমান, তার চেয়ে অনেক বেশি উপলব্ধিজাত। ছোটশিশুটি যে মায়ের বুকে খেলতে খেলতে তার বুকে পদাঘাত করে এবং সে আঘাতে মা যে আনন্দ অনুভব করেন, সেটিই সৌন্দর্যেও প্রকৃত আধার এবং সে রকম অনুভবই হচ্ছে শিল্পের মূল উৎস। তিনি বলেন, শিশু ধর্ম হচ্ছে পৃথিবীর প্রাচীনতম ধর্ম। যেখানে একজন শিশুর কাছে মায়ের বিয়ের দিনের সুসজ্জিত ছবির চেয়ে তার আট পৌঢ়ে জীবনের নিত্যদিনের দৃশ্যমান সাদা মাঠা ছবিটি অনেক বেশি আকর্ষণীয়। ফলে একজন প্রকৃত বোধ সম্পন্নশিল্পী কে শিল্পের সেই নান্দ্যনিক তার জায়াগটিই পরম মমতা ও উপলব্ধি দিয়ে আবিষ্কার করতে হবে।
‘মিনা’ কার্টুন এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘নতুনকুড়ি’, ‘মনের মানুষ’ ইত্যাদি অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে বলতে যেয়ে তিনি জানান যে, বস্তুত শিশুতোষ কল্যাণ চিন্তা থেকেই এ অনুষ্ঠান গুলো নির্মাণ ও সম্প্রচার করা হয়েছিল । ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী যখন বেতার-টেলিভিশনে রবীন্দ্রনাথের লেখা গান ও নাটকের সম্প্রচার প্রায় নিষিদ্ধ করেছিল, তখন বিশ্বসাহিত্য ও নাটকের সঙ্গে বাঙালির পরিচয় ঘটানোর জন্য বিটিভি থেকে তিনি অতি কৌশলে নির্মাণ কওে ছিলেন শেক্সপিয়ারের‘ট্রেমিং অব দ্য শ্র’র মুনীর চৌধুরী অনূদিত নাটক‘মুখরারমনীবশীকরণ’।উল্লেখ্য,পওে তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকটি ওি নর্মাণ করেন এবং এ দুটি নাটকই পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যেও গ্রানাডা টেলিভিশনের ওয়ার্ল্ডহিস্ট্রি অব টিভিড্রামায় অন্তভুক্ত হয়।
‘মানুষের জন্য শিল্প নাকি শিল্পের জন্য মানুষ’এরূপ বিতর্ক প্রসঙ্গে মুস্তফা মনোয়ার বলেন, প্রকৃত শিল্পী বস্তুতঃতার বোধ ও উপলব্ধিগুলোকে চিত্রকলায় তুলে ধরেন। পরে সেটি জণগণেরকার কল্যাণে কোনটি ব্যবহৃত হচ্ছে বা হচ্ছে না, সে ব্যাপারে শিল্পীর দায় নির্ধারণ সমীচীন নয় । তিনি লাস্ট সাফার, মোনালিসা ও গোয়ের্নিকাকেমহৎ শিল্পকর্ম উল্লেখ করেন এবং রবীন্দ্রনাথকে অনেক বড় চিত্রশিল্পী হিসেবে তুলে ধরেন। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, মানবধর্ম জীবনের আদর্শ হিসেবে ধারণ কওে শিল্প ও সাহিত্যেও সর্বত্রচারি তার এমন অসাধারণ দৃষ্টান্ত পৃথিবীর আর কোথাও কারো ক্ষেত্রেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনি বাংলাদেশের সামাজিক মূল্যবোধের অধঃগামিতা ও সংস্কৃতির ক্রমমানহীনতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বিদেশী চ্যানেলের বিভিন্ন বাংলা নাটকে অহর্নিশ নারীকে হীন মানিসকতা সম্পন্ন ভাবে তুলে ধরার প্রবণতার নিন্দা করেন এবং এ ব্যাপাওে নারীদেরকে প্রতিবাদী হওয়ার আহবান জানান। অনুষ্ঠানে মুস্তফা মনোয়ার উপস্থিত শ্রোতা মন্ডলীকে কিছু ছবিও এঁকে দেখান।
স্টেট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক এম শাহজাহান মিনা তার সভাপতির ভাষণে বলেন, স্টেট ইউনিভার্সিটি তার শিক্ষার্থীদেও মেধা ও মননের বিকাশ সাধনের লক্ষ্যে শ্রেণি কক্ষ বহির্ভূত এসব নান্দনিক বিষয় নিয়ে ও বিভিন্ন ধরনের সেমিনার, কর্মশালা, বক্ততা ইত্যাদিও আয়োজন চলেছে।আগামীদিনে এ কার্যক্রমকে আরো জোরদার অঙ্গীকার ব্যক্ত কওে তিনি বলেন যে, এসইউবি তার শিক্ষাদান কার্যক্রমকে বাস্তব অর্থেই বিশ^ মানের করে তোলার ব্যাপাওে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এসইউবির প্রো-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আনোয়ারুল কবিরতার বক্তব্যে মোস্তফা মনোয়ার কে বাংলাদেশের সমাজ বিকাশের ধারায় একজন অতি উচ্চমানের শিল্পী হিসেবে অভিহিত করেন। আবু তাহের খান তার স্বাগত বক্তব্যে মুস্তফা মনোয়ারের জীবন ও কর্মেও উপর আলোকপাত করতে যেয়ে বলেন যে, সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মুস্তফা মনোয়ারের প্রায় প্রতিটি উদ্যোগ অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এসইউবির গণসংযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান সাহস মুস্তাফিজ। অনুষ্ঠানে এসইউবির বিভিন্ন স্তরের অধ্যাপক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।